শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ০২:৩২ অপরাহ্ন
নোটিশ ::
প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। বিস্তারিত জানতে : 01712-758460 | প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। বিস্তারিত জানতে : 01712-758460 | প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। বিস্তারিত জানতে : 01712-758460 |

খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে বানভাসিরা

এমসি নিউজ ২৪ ডেস্ক
  • আপডেট সময় রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০
  • ২৯ বার পড়া হয়েছে
মৌসুমের শেষে বৃষ্টির দাপট সেইসাথে উজানের ঢালে নেমে আসা পানিতে ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার বন্যা পরিস্থিতি। পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে লাখ লাখ মানুষ। এ পর্যন্ত বন্যার পানিতে শিশুসহ মারা গেছে শতাধিক মানুষ। ডুবে গেছে শত শত মাছের ঘের। নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রয়েছে হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। এগুলো ছাপিয়ে বানভাসী এলাকাগুলোতে বর্তমানে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান ও সমন্বয় কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, নাটোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে বন্যা কবলিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বন্যায় এসব জেলার ৭ লাখ ৩১ হাজার ৯৫৮টি পরিবারের ৩০ লাখ ৪০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে পর্যবেক্ষণাধীন ১০১টি পানি স্টেশনের মধ্যে বাড়ছে ৪৯টির, কমছে ৪৯টির এবং স্থিতিশীল রয়েছে ৩টির। বন্যা আক্রান্ত জেলা ২০টি। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে ১৯টি নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। আর বিপৎসীমার ওপরে পানি প্রবাহিত হওয়া স্টেশনের সংখ্যা ৩০টি। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। উত্তর-পূর্বা লের উজান মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঢাকা জেলার আশপাশের নদীগুলোর পানি বাড়ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
সূত্র জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেত্রকোনা জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও ঢাকা জেলার নিম্ন লে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। অপরদিকে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নওগাঁ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ মানুষ এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে। অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে তাদের। দীর্ঘদিন ধরে বন্যা পরিস্থিতি চলমান থাকলেও দুর্গত এলাকায় এখনও সরকারি ত্রান ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন আমাদের সংবাদদাতারা।
কুড়িগ্রামের সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে বানভাসী মানুষের সংখ্যা। জেলার ৯ উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন ভাসছে বানের পানিতে। পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন দুই লক্ষাধিক মানুষ। তারা আশ্রয় নিচ্ছেন উঁচু বাঁধ, পাকা সড়ক ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এ পর্যন্ত বন্যার পানিতে মারা গেছে ১৯ জন। ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় অনেকেই ঘরের ভেতর মাচা করে অথবা নৌকায় আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়াও বেশিরভাগ পরিবার অন্যের উঁচু বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। পরিবারে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।  বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও ফসলের মাঠ। ভেসে গেছে কয়েকশ পুকুরের মাছ। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে চর-দ্বীপচরের স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোতে। ফলে লক্ষাধিক মানুষ রয়েছে চরম দুর্ভোগে। খোলা স্থানের অভাবে সেনিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
লালমনিরহাট সংবাদদাতা জানান : তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বসতবাড়িতে পানি উঠেছে। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে ৩ উপজেলার নদীসংলগ্ন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। এ পর্যন্ত বন্যায় মারা গেছে ১০ জন।

বন্যাদুর্গতরা জানান, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদি পশু-পাখি নিয়েও বিপাকে পড়েছেন তারা। পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও মিলছে না চিকিৎসা সেবা। এখনও পর্যন্ত কেউ কোনো সহায়তাও করেনি।

এ বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বলেন, দুর্গতদের জন্য ত্রান বরাদ্দ হয়েছে। এখনো হাতে পাইনি। সহায়তার জন্য দুর্গতদের তালিকা করা হচ্ছে। আশা করছি ক্ষতিগ্রস্ত সবাই তালিকাভুক্ত হবে এবং সহায়তা পাবে।
জামালপুর সংবাদদাতা জানান, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও শাখা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে জেলার ৬ উপজেলার ২৬ ইউনিয়ন। বন্যার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে জেলার প্রায় ৯০টিরও বেশি প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বন্যার পানিতে এ পর্যন্ত মারা গেছে অন্তত ২৫ জনেরও বেশি। বন্যা কবলিত অধিকাংশ মানুষ এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে। অর্ধাহারে-অনাহারে তাদের দিন কাটছে। তারা সরকারের কাছ থেকে এ পর্যন্ত কোনো সহায়তা পায়নি বলে জানা গেছে।
গাইবান্ধার সংবাদদাতা জানান, গাইবান্ধায় গতকাল নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে ৩ টি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ফারাজিপাড়া এলাকায় গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের কিছু অংশ ডুবে গেছে। ফলে যানবাহন চলাচল ঝুঁঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আজ পর্যন্ত এ জেলায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বন্যার পানিতে নিচু অ লের টিউবওয়েলগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কেউ কেউ অনেক কষ্ট করে দূর থেকে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করে পান করছেন। তবে অধিকাংশ লোকের ভাগ্যেই জুটছে না এ বিশুদ্ধ পানি।
জেলা প্রশাসক বলেন, সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় চাল এবং শুকনো খাবার এবং নগদ টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। এসব বরাদ্দ বুঝে পেলেই ত্রান সহায়তা দেয়া শুরু হবে।
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও পানির সংকট। সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ছাতক, শাল্লা, জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলার প্রায় ১ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সুনামগঞ্জে প্রায় এক হাজার একর জমির আমন ধান ও বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে তিন শতাধিক পুকুরের মাছ। রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীতে পানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জেলার ৫ উপজেলার ৫১টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এ জেলায় এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৪ জন। চরা লে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে অসংখ্য মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। ভেসে গেছে তিন শতাধিক পুকুরের মাছ। কৃষকের বোনা ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে বর্তমানে বন্যার্তদের মধ্যে খাদ্যের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত সাহায্য পেলেও বি ত রয়েছেন দুর্গতদের বড় একটি অংশ। সরকারি কোন সহায়তা এখনও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, মানিকগঞ্জ জেলায় ৩-৪ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ৭ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইতিমধ্যে বন্যজনিত কারণে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যা কবলিতরা দিন কাটাচ্ছেন অনাহারে অর্ধাহারে। টিউবয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভুগছেন বিশুদ্ধ পানি সংকটেও।
এছাড়া রংপুর, বগুড়া, সিলেট, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, ফরিদপুর, নেত্রকোনা , নওগাঁ, ফেণী, শরীয়তপুর ও মুন্সিগঞ্জের পরিস্থিতিও প্রায় একই রকম।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলমান বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তায় ২৭ জেলার জন্য এক হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন চাল, ৮৭ লাখ টাকা ও ১৪ হাজার অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। টাকার মধ্যে ১৩ লাখ ত্রাণ হিসেবে বিতরণ, গো খাদ্যের জন্য ৫৪ লাখ এবং শিশু খাদ্যের জন্য ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ঢাকা, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, নাটোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে এই সহায়তা দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ করা এই সহায়তা শুধুমাত্র আপদকালীন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া অন্য কোনো কাজে এ বরাদ্দ বিতরণ করা যাবে না।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের অনুক‚লে এই বরাদ্দ দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর
© All rights reserved © 2018 mcnewsbd24.Com
Customized by Mcnewsbd24.Com